দেশ ছেড়েছি এক যুগ হোল, তাই গত বারটি পহেলা বৈশাখ কেটেছে দেশের বাইরেই। এই বার বছরে দেশের অনেক বড় বড় পরিবর্তন হয়েছে, এর মধ্যে আন্যতম হচ্ছে পহেলা বৈশাখ উদযাপন।

যখন দেশ ছেড়েছিলাম, পহেলা বৈশাখ তখন ছিল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক বড় নগরগুলোর কিছু সাংস্কৃতিক বৈদগ্ধ নাগরিকের বার্ষিক বিনোদোন। ঢাকার রমনার বটমূল অথবা চট্টগ্রামের ডিসি হিলে ভোর থেকে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন হোত আর সহস্র অনধিক মানুষ তা উপোভোগ করতেন। নাগরিক এই রিচুয়াল টার শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে, ৬৭ ইংরেজী সনে। আইয়ুব সরকার কর্তৃক রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ছায়ানট বাংলা নববর্ষকে রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে বরন করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

 

দেশের গ্রামে যা হোত তা হোল বৈশাখী মেলা। তখন তো যোগাযোগ ব্যাবস্থা এত ভাল ছিল না, বৈশাখী মেলাই ছিল গ্রামের মানুষের জন্য শহুরে মনোহরী পন্য সামগ্রী ক্রয়ের একমাত্র সুযোগ।

গঞ্জে বাজারে হোত হালখাতা। হালখাতা মানে হচ্ছে মিলাদ অথবা পুজো পার্বনের মাধ্যমে ব্যাবসায়ীদের নুতন বছর নুতন হিসেবের খাতা খোলা। মিলাদ অথবা পুজো উপলখ্যে উপস্থিত সবাইকে মিষ্টি অথবা বিরিয়ানী দেয়া হোত।

 

পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে গত এক যুগে। নগরের গুটিকতক সাংস্কৃতিক বৈদগ্ধ মানুষের বার্ষিক রবীন্দ্র সংগীত বিনোদোন থেকে পহেলা বৈশাখ এখন শহর, মফস্বল, গঞ্জের মানুষের  এক সার্বজনীন উৎসবে পরিনত হয়েছে। রমনা এলাকা অথবা ডিসি হিল এলাকা গুলো পরিনত হয়ে নগরবাসীর মিলন মেলায়। এখন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যোগ দিয়েছে বাংগালীর এই উৎসবে।

শিশু, কিশোর, তরুন, তরুনী, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা মুখে আলপনা একে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নগরীর লেকে মংগল প্রদীপ ছাড়া হচ্ছে হাজার হাজার। বিভিন্ন আকারের কাঠের তৈরী পাখী, পশু ইত্যাদির প্রতিকৃতি, ভংকর দর্শন কিছু মুখোশ নিয়ে বিশাল শোভাযাত্রা ঘুরছে রাজপথ ধরে।

এগুলো কিন্তু কোনটাই আবহমান বাংলার ঐতিহ্য নয়। মংগল শোভাযাত্রা বলুন আর মুখে আলপনা আকা বলুন, এগুলো কোনদিন ই গ্রাম বাংলার পহেলা বৈশাখ এর অংশ ছিল না। কিন্তু মানুষ খুব দ্রুতই এগুলোকে নিজেদের প্রানের উতসব হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছে। আসলে আমাদের মুসলমান বাংগালী সমাজে সত্যিকারের উৎসবের খুব ই অভাব। ঈদ একটা খুব ই ঘরোয়া উৎসব। পহেলা বৈশাখ হয়ত আমাদের উৎসবের অভাব ঘুচাবে।

আজ খবরে দেখলাম প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক বৈশাখী মেলায় এক শিশুর মুখে আলপনা আকা হচ্ছে। আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখ এখন আর আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য উদযাপন নয়। পহেলা বৈশাখ এখন চারকলা চত্বরে উদ্ভাবিত সংস্কৃতির গ্রাম বাংলার বিজয়।

Advertisements