স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে তো ঝগড়া ঝাটি কম হয় নি। আবার আর একটা ঝগড়া শুরু করার সামান্যতম আগ্রহ আমার নেই। তা সত্বেও সাহস করে কিছু বলতে চাই এই  স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে।

  

  

প্রথমত  স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে বি এন পি র কর্মকান্ড আমার কাছে সবসময়ই অপরিপক্ক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বিবর্জিত মনে হয়েছে। বি এন পি র ভাষ্যে মনে হয়, বলা নেই কওয়া নেই জিয়াউর রহমান সাহেব হঠাত করে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে দিলেন আর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল। বি এন পি যেভাবে ৭১ পুর্ববর্তি ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধু র নেতৃত্ব কে ইতিহাস থেকে বাদ দিয়ে দিতে চেয়েছে, সেভাবেই তারা আমাদের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের এক নেতৃস্থানীয় সেনানী হিসাবে জিয়াউর রহমানের অবদান এবং তাঁর ২৭ শে মার্চের ঘোষনার যথার্থ  মুল্যায়ন করতে সম্পুর্ন ব্যর্থ হয়েছে।

  

  তবে প্রথমেই বলে নেই যে আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদেশের স্রষ্টা হিশেবে একজনের নাম বলতে হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নাম ই বলতে হবে। 

  

    

 তারপর বলি, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে এক টা গুরুত্বপূর্ন গোষ্ঠীর অবদান আমরা কখনই যথার্থ ভাবে মূল্যায়ন করতে পারি নি। তা হল আমাদের নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর অবদান।

  

    

 পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র নয় মাসে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হবার আর কোন নজির নেই। ন মাস কেন ন বছরেও সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীন হতে পেরেছে, এমন জাতিও সহজে খুজে পাওয়া যাবে না।  

  

    

কিভাবে আমরা স্বাধীন হলাম ন মাসে? ভৌগলিক অবস্থান একটা factor ছিল সন্দেহ নেই। ভারতের প্রকাশ্য মুক্তহস্ত সহযোগীতা ও আরেক টা প্রধান কারন। তবে এ সবগুলোর জন্যেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রস্তুত ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তৈরী ছিল দীর্ঘ একটা গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য, in the worst case scenerio ওরা আর একটা কাশ্মীরের জন্য  মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিরপেহ্ম বিশ্লেষন গুলো পরে দেখুন। একটা ঘটনার জন্য ওরা একেবারে প্রস্তুত ছিল না তা হল নিয়মিত সেনা বাহিনীর বাঙ্গালী ইউনিট গুলোর গন বিদ্রোহ। ওরা এটা ভাবতেই পারে নি যে সামরিক বাহিনীর ইউনিট গুলো এতটা সুশৃংখল  ভাবে বেসামরিক নেতৃত্বের অধীনে একতাবদ্ধ হতে পারবে। এটা সত্যি যে , সেনাবাহিনীর জাতি ভিত্তিক ট্রুপ গুলোর শতভাগেরই বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেয়া একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। মানব জাতির  বিচ্ছিন্নতাবাদের ইতিহাসে এধরনের ঘটনা তেমন আর ঘটে নি।

  

    

আর এই বিশাল ঘটনা জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পরে যার অবদান অনস্বীকার্য তিনি হচ্ছেন জিয়াউর রহমান। সক্রিয় দায়িত্বে থাকা একজন সিনিয়র অফিসারের বিভিন্ন ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টএর সৈন্য নিয়ে বিদ্রোহ, পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার কে বন্দী করা এক্ টা প্রচন্ড উদ্দীপনামূলক ঘটনা ছিল বাংগালী সকল সেনা সদস্যের জন্য। জিয়াউর রহমানের রেডিও ঘোষনা বারুদে স্ফূলিঙ্গের মত কাজ করে সারা দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে। একে একে বিদ্রোহ করতে থাকে বাংগালী সব গুলো ইউনিট। ভারতের আতিথেয়তায় শুরু হয়ে নিয়মিত এক সশস্ত্র যুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষন। উলটা পালটা হয়ে যায় পশ্চিমাদের সব হিসেব নিকেশ।

  

  

আর একটা কথা। এটা সত্যি স্বাধীনতার  ঘোষনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়ে গিয়েছেন দফায় দফায়। সাত ই মার্চ ছিল একটি পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধুর সাত ই মার্চ ভাষন যেমন বাংগালীর মনে আবেগ জুগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস, তেমন ই সামরিক বাহিনীর একজন সিনিয়র বাংগালী অফিসার জিয়াউর রহমান এর আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের ঘোষনা অবরুদ্ধ বাংগালীকে সাহস জুগিয়েছে সেই নয় টি মাস। সব বাঙ্গালীর কাছেই, মুক্তাঞ্চল বলুন আর অবরুদ্ধ বাংলাদেশ বলুন,  সর্বত্রই জিয়াউর রহমান সাহেবের এই ঘোষনাটার মূল্য ছিল অপরিসীম। একজন সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছাড়াও এই একটি ঘোষনার  কারনেও জিয়াউর রহমানের নাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে থাকবে।

  

      

বাংলাদেশ এমন মানুষের সখ্যা কম নয় যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ এবং এর সঠিক ইতিহাস প্রকাশের বিরামহীন সৈনিক। অধ্যাপক মুহাম্মাদ জাফর ইকবাল এদের একজন। গত ষোলই ডিসেম্বার দৈনিক প্রথম আলোতে এক টি কলামে তিনি তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন অবশেষে স্কুলের পাঠ্য বই এ স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস প্রকাশিত হতে যাচ্ছে ভেবে। ১/১১ এর পট পরিবর্তনের পর নুতন সরকার এসে অনেক কিছুই করে নি, আবার অনেক কিছুই করেছেও। এক টা হচ্ছে স্কুলের পাঠ্য বই এ বাংলাদেশের ইতিহাস পরিবর্তন করা। এই পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান সাহেব হয়ে গিয়েছেন স্বাধীনতার ঘোষনার পাঠক।

  

    

 আর যে কারনেই হোক জিয়াউর রহমান সাহেব অনুষ্ঠান ঘোষকের চাকুরীর জন্য চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র  দখল করেন নি। জিয়াউর রহমান সাহেব যা বলেছিলেন, তা উনি না বলে একজন অনুষ্ঠান ঘোষক বললে এর কোন মূল্য থাকতো না।  

রেডিও টিভি তে কোন কিছু পাঠ করেন একজন অনুষ্ঠান ঘোষক। প্রধান মন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি অথবা চীফ এডভাইজার যখন রেডিও টিভি তে কোন কিছু পড়েন, তা হচ্ছে তাদের ঘোষনা অথবা বক্তৃতা। এটাকে কেউ ভাষন পাঠ অথবা অর্থমন্ত্রীর বাজেট পাঠ বলে না। তবে যে তরুন অথবা তরুনী এই অনুষ্ঠানের ঘোষনা দেন তিনি হচ্ছেন অনুষ্ঠান ঘোষক অথবা ঘোষনা পাঠক। মূল বিষয় হচ্ছে যে জিয়াউর রহমান সাহেব তো কারো দারা আদিষ্ট হয়ে অথবা কোন উর্ধতনের নির্দেশে অন্য কারো লিখা বিবৃতি পাঠ করেন নি।    

    

 ওইদিন জিয়াউর রহমান সাহেব স্বতপ্রনোদিত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ন ঘোষনা দিয়েছিলেন। ওটা স্বাধীনতার ঘোষনা আমি এটা বলব না। কিন্তু এটা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ঘোষনা, হয়তো এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘোষনা।

  

  জাফর ঈকবাল স্যার রা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের কথা বলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানকে একজন সাধারন রেডিও ঘোষকের পর্যায়ে নামিয়ে এনে ইতিহাস লিখার চেষ্টা দেখে ওনাদের আসল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আমরা বিভ্রান্ত হই।